আফগানিস্তানের ইতিহাস: দেশটি এক দারুণ রোমাঞ্চকর ও সাহসীকতার উদাহরণ

আফগানিস্তানের ইতিহাস দেশটিকে এক দারুণ রোমাঞ্চকর ও সাহসী দেশের উদাহরণ হিসেবে হাজির করে। প্রথমে ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক শক্তি, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির পরাজয় একটি শিক্ষাই দেয়, সাহসী জাতির সামনে এ ধরনের শক্তিগুলোর পরাজয় সময়ের ব্যাপার।

লেখকঃ ড. এম সাখাওয়াত হোসেন; নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা।

© প্রথম আলো

আফগানিস্তানে সবাই হেরেছে, যুক্তরাষ্ট্রও হারলবিগত প্রায় তিন দশক আফগানিস্তানের যুদ্ধ আর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই পত্রিকাতেই বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছি। আমার চাকরিজীবনে পশতুনদের, বিশেষ করে আফগান জাতি-উপজাতিগুলোর সম্বন্ধে বিস্তারিত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম। এরই প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত দখলদারির পরিণতি ও পরবর্তী সময়ে টুইন টাওয়ারে হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান আক্রমণ প্রভৃতি নিয়ে ২০০২ সালে আমার লেখা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের ইতিকথা: আফগানিস্তান হতে আমেরিকা বইটি প্রকাশিত হয়। আমার এই বই লেখায় যে দুই ব্যক্তি সহযোগিতা করেছিলেন তাঁদের একজন জেনারেল বাবর, পাকিস্তানের একসময়ের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অপরজন আমার পূর্বপরিচিত প্রয়াত কর্নেল সুলতান আমির। এঁরা দুজনই ইতিহাসে প্রথমে মুজাহিদীন ও পরে তালেবানের গুরু বলে পরিচিত। এঁদের এবং আমার বিশ্লেষণে আফগান ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে লিখেছিলাম, রাশিয়ার মতো না হলেও ভিয়েতনামের পর আমেরিকাকে আফগানিস্তানেও কৌশলগত পরাজয়ের মুখ দেখতে হবে। কারণ, স্বাধীনচেতা আফগানদের ধরে রাখা বা পদানত করার কোনো ইতিহাস এ পর্যন্ত নেই।মনে পড়ে, ২০০৮ সালে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস ফ্রান্সিস মরিয়ার্টি আফগানিস্তান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমার মতামত চেয়েছিলেন। আমার যৎসামান্য অভিজ্ঞতার আলোকে বলেছিলাম, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের পরিণতি উনিশ শতকের ব্রিটিশরাজ এবং বিংশ শতাব্দীর রাশিয়ার মতো না হলেও ভূকৌশলগত পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। ইতিহাস থেকে উদাহরণ টেনে তাঁকে আরও বলেছিলাম ১৮৪২ সালের ব্রিটিশ-আফগান প্রথম যুদ্ধে ওই সময়ের দখলদার বাহিনীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন উইলিয়াম ব্রাইডেনের কাহিনি পড়তে। যেখানে ৪ হাজার ৫০০ সৈন্য ও ১২ হাজার সাধারণ কর্মচারী, নারী-পুরুষ আফগানদের হত্যাযজ্ঞের শিকার হন। আজও বলা হয়, একমাত্র ব্রাইডেন আফগানিস্তান থেকে বেঁচে এসেছিলেন।২০০৮ সালের ওই সন্ধ্যায় জেমস মরিয়ার্টি শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়েছিলেন। জানি না, তাঁর কী ধারণা হয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশে নিযুক্তির আগে তিনি পাকিস্তানে ছিলেন। আমার বইয়ের কথা উল্লেখ করে তাঁকে বলেছিলাম, ভিয়েতনামের পরিণতি এড়াতে হলে মুখরক্ষার আবরণে যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান ত্যাগ করতে হবে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের এই উপলব্ধি হতে আরও ১৩ বছর লাগল। পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটাতে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দোহা চুক্তির আড়ালে ২ জুলাই মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে বড় বাগরাম ঘাঁটি ছেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ঘোষণা অনুযায়ী এ বছরের ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাকি সৈন্য আফগানিস্তান ত্যাগ করবে।২০ বছর আগের তালেবানের সঙ্গে বর্তমান তালেবান যোদ্ধা ও নেতৃত্বের মধ্যে অনেক তফাত রয়েছে। বর্তমানের নেতারা এখন পর্যন্ত বেশ উদার মনোভাব দেখাচ্ছেন।এভাবে আফগানিস্তান তালেবানের হাতে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের বিতর্ক হচ্ছে, বিশেষ করে কাবুলের আশরাফ গনির সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কারণ, ওই সরকারের সঙ্গে এখন পর্যন্ত ক্ষমতা ভাগাভাগি বা অন্য কোনো বিষয়ে তালেবানের আলাদা চুক্তি হয়নি বা হবে বলেও মনে হয় না। ইতিমধ্যে তালেবান বাহিনী এককভাবে আফগানিস্তানের এক-তৃতীয়াংশ দখল করে নিজেদের শাসন কায়েম করেছে। দেখা যাচ্ছে আফগানিস্তানের ৪২১ জেলা একে একে তালেবানের দখলে চলে আসছে। কোথাও কোথাও সরকারের বাহিনী বিনা যুদ্ধে অথবা পরাজিত হয়ে জেলাগুলো ছেড়ে দিচ্ছে। সরকারি বাহিনীর শত শত সদস্য দল ত্যাগ করে তালেবানের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন অথবা বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় খুঁজছেন। হাজারখানেক তাজিক-আফগান সৈন্য তাজিকিস্তানে আশ্রয় নেওয়ার খবর এরই মধ্যে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তালেবানের সমগ্র আফগানিস্তান দখল সময়ের ব্যাপার মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএর মতে, ছয় মাসের মধ্যেই কাবুল সরকারের পতন হবে।২০ বছর আগের তালেবানের সঙ্গে বর্তমান তালেবান যোদ্ধা ও নেতৃত্বের মধ্যে অনেক তফাত রয়েছে। বর্তমানের নেতারা এখন পর্যন্ত বেশ উদার মনোভাব দেখাচ্ছেন। যেমন মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বা কলেজে লেখাপড়ার বিষয়ে তাঁরা তাঁদের নিজস্ব ঐতিহ্য এবং শরিয়া অনুযায়ী চলায় বিশ্বাসী। সে ক্ষেত্রে মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে নারীদের দ্বারাই পরিচালিত হবে, এমন কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাদের নেতারা বলেছেন। তালেবানের দখল করা অঞ্চলে তেমনটাই দেখা যাচ্ছে। অপর দিকে বিদেশি এনজিওগুলোর ব্যাপারেও আগের চেয়ে উদার মনোভাব দেখাচ্ছে। তবে পুরো ক্ষমতা দখলের পর তালেবান কী আচরণ করবে, সে ব্যাপারে অনেকেই সন্দিহান। তালেবানের আপত্তি যেকোনো অজুহাতে বিদেশি সৈন্যদের উপস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র হাজারখানেক সৈন্যের স্থায়ী উপস্থিতির কথা বলেছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে তালেবান মুখপাত্র সোহাইল শাহিন বলেন, সেপ্টেম্বরের পরে যেকোনো বিদেশি সৈন্যকে শত্রু মনে করা হবে। এ ধরনের হুঁশিয়ারি নিছক নয় বলে ধারণা করা যায়।আন্তর্জাতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ অপসারণ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। অনেকে মনে করেন যে এতে সন্ত্রাসবাদ আবারও ফিরতে পারে। ইতিহাস বলে, আফগানিস্তানে সোভিয়েতের পতনের পর পশ্চিমা বিশ্ব আল–কায়েদাকে তোষণ করেছিল। ওই সময়কার তালেবান নেতৃত্ব শক্তি ও অর্থের প্রয়োজনে তাদের ছাড়তে পারেনি। কিন্তু এ নতুন প্রজন্মের তালেবানের সে দায়িত্ব নেই এবং এখন পর্যন্ত নিজেদের শক্তিই তারা ব্যবহার করে এসেছে। এখনকার তালেবান নেতৃত্ব মোল্লা ওমর, দাদুল্লাহ অথবা হেকমতিয়ারের প্রজন্মের নয়। এ পর্যন্ত তালেবান সদস্যদের বিরুদ্ধে সীমানার বাইরে কোনো ধরনের সন্ত্রাসে যুক্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তালেবানের নেতৃত্বের বক্তব্যের মধ্যে আইএসকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রয়াত মোল্লা ওমরের নামে তালেবান পরিচালিত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নতুন নেতৃত্বে অনেকটা উদারতা দেখা যাচ্ছে।আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরুত্থান গত ২০ বছরের ভূরাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে। এ আলোচনায় মধ্যস্থতা করে পাকিস্তান তালেবানের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী প্রমাণিত হয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি তৈরির প্রস্তাব পাকিস্তান প্রত্যাখ্যান করার পর থেকে। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ হিসেবে ভারতের আফগান নীতিতে বেশ পরিবর্তন আসতে পারে। আফগান-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই যথেষ্ট কৌতূহল তৈরি হয়েছে।অপর দিকে পাকিস্তান-চীন অর্থনৈতিক করিডরে আফগানিস্তানকে শামিল করার প্রয়াস বেশ আগে থেকেই চলছে। যেহেতু চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে, সে ক্ষেত্রে চীনের বেল্ট রোড প্রকল্পের আওতায় আফগানিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অপর দিকে ইরানের চা বাহার বন্দর চীনের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে আফগানিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগেও চীন যথেষ্ট উদ্যোগী হবে। তা ছাড়া পাকিস্তানের চমন-কান্দাহার যোগাযোগের মাধ্যমে আফগানিস্তানকে বিআরআই এবং গোয়দার অথবা বিন কাসেম বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা রয়েছে বলে বিশ্বাস।যাহোক, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে প্রায় ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ এবং প্রায় ২ হাজার ৫০০ সৈন্যের মৃত্যু, প্রায় ২০ হাজার আহত যোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষের যে রক্ত ঝরেছে, তাতে এ অঞ্চলের অস্থিরতা কিছুটা হলেও বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রায় শূন্য হাতে ফিরে যাচ্ছে বলে মনে হয়। যে চীনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এত প্রতিযোগিতা, সেই চীনকেই এ অঞ্চলে ভূকৌশলগত শক্ত অবস্থানে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার। ভারত-পাকিস্তান-চীন প্রতিযোগিতার কারণে সামনে এ অঞ্চল আরও অস্থিরতায় পড়তে পারে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।আফগানিস্তানের ইতিহাস দেশটিকে এক দারুণ রোমাঞ্চকর ও সাহসী দেশের উদাহরণ হিসেবে হাজির করে। প্রথমে ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক শক্তি, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির পরাজয় একটি শিক্ষাই দেয়, সাহসী জাতির সামনে এ ধরনের শক্তিগুলোর পরাজয় সময়ের ব্যাপার। তালেবান বলেছিল, ‘ওদের হাতে রয়েছে সব ঘড়ি, আর আমাদের হাতে রয়েছে সময়।’ আফগানিস্তানে প্রায় ৩০ বছরের রক্তপাত বন্ধ হোক, সেটাই প্রত্যাশা।

About kontol123

Gaming is a part of our life. Enjoy gaming, Enjoy your life

View all posts by kontol123 →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *